মাগুরা প্রতিদিন: ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠের প্রাণচাঞ্চল্য ফিরিয়ে আনতে এক অভিনব বিপ্লব ঘটেছে মাগুরার শ্রীপুর সরকারি ডিগ্রি কলেজে। ক্লাসে ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ বন্ধ করতে যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ফেস স্ক্যানিং প্রযুক্তি, আর ক্যাম্পাসকে সুশৃঙ্খল করতে আনা হয়েছে একঝাঁক কড়া নিয়ম।
কলেজ প্রশাসনের এই ব্যতিক্রমী ও যুগোপযোগী উদ্যোগের ফলে মাত্র কয়েকদিনেই পাল্টে গেছে পুরো কলেজের চিত্র। দূর হয়েছে বহিরাগতদের উপদ্রব, আর ক্লাসরুমগুলোতে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বেড়েছে চোখে পড়ার মতো।
এই আধুনিক রূপান্তরের বড় একটি অংশ জুড়ে রয়েছে কলেজের ডিজিটাল হাজিরা ব্যবস্থা। একাদশ শ্রেণীর ছাত্র তানভীর সিফাত জানায়, কলেজের প্রথম দিন থেকেই শিক্ষকরা তাদের ডিজিটাল হাজিরার ডিভাইসটির সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। প্রতিদিন যখন তারা কলেজে আসে এবং বের হয়, প্রতিবার মেশিনটির সামনে দাঁড়ালেই ফেস স্ক্যান হয়ে হাজিরা তৈরি হয়ে যায়। সবচেয়ে বড় বিষয়, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির এই বার্তাটি সাথে সাথেই পৌঁছে যায় অভিভাবকদের ফোনে। আরেক শিক্ষার্থী ইসরাত জাহান এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলে, এই ব্যতিক্রমী নিয়মগুলো চালু থাকলে শিক্ষার প্রকৃত পরিবেশ বজায় থাকবে এবং তারা নির্বিঘ্নে ও সুশৃঙ্খলভাবে ক্যাম্পাসে পড়াশোনা করতে পারবে।
ডিজিটাল এই রূপান্তর সম্পর্কে কলেজের সহকারী শিক্ষক সাদাত হোসেন জানান, এই ডিজিটাল হাজিরা ব্যবস্থাটি সরাসরি একটি কেন্দ্রীয় ওয়েবসাইটের সাথে সংযুক্ত, যা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচ্চ পর্যায় থেকে মনিটরিং করা হচ্ছে। একজন শিক্ষার্থী কখন কলেজে ঢুকছে আর কখন বের হচ্ছে, তার নিখুঁত রেকর্ড থাকছে এখানে। কোনো শিক্ষার্থী অনুপস্থিত থাকলেও স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার অভিভাবকের মোবাইলে মেসেজ চলে যাচ্ছে।
১৯৬৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের এমন ইতিবাচক পরিবর্তন প্রসঙ্গে কলেজের অধ্যক্ষ নির্মল কুমার সাহা বিস্তারিত আলোকপাত করেন।
তিনি বলেন, দেশ যখন একটি বিশেষ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, তখন অনেক শিক্ষার্থীই শ্রেণীপাঠ বিমুখ হয়ে পড়েছিল। সরকারের নির্দেশনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কলেজের একাডেমিক কাউন্সিল ও শিক্ষক পরিষদ দফায় দফায় সভা করে এই নতুন কর্মপন্থা নির্ধারণ করে। তারা প্রধানত চারটি শাখায়—একাডেমিক, অবকাঠামো, সহ-শিক্ষা কার্যক্রম (কো-কারিকুলার) এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে জোর দিয়ে কলেজকে এগিয়ে নিচ্ছেন।
নতুন এই নিয়মের অধীনে শিক্ষার্থীদের ক্লাসে উপস্থিতি ৭০% হলে ‘কলেজিয়েট’ এবং ৬০% থেকে ৭০% হলে ‘নন-কলেজিয়েট’ গণ্য হবে। তবে ৬০%-এর নিচে উপস্থিতি হলে তাকে ‘ডিস-কলেজিয়েট’ হিসেবে পরীক্ষায় অংশ নিতে দেওয়া হবে না। এর পাশাপাশি প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে নির্দিষ্ট ইউনিফর্ম পরে এবং গলায় আইডি কার্ড ঝুলিয়ে ক্যাম্পাসে ও ক্লাসে প্রবেশ করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সকাল ১০:৩০ মিনিটের পর কলেজের মূল গেট বন্ধ করে দেওয়া হয়, যার পর বিশেষ অনুমতি ছাড়া কোনো শিক্ষার্থীর প্রবেশের সুযোগ থাকে না। এছাড়াও কলেজ ক্যাম্পাসের ভেতরে শিক্ষার্থীদের মোবাইল ফোন ব্যবহারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে এবং কলেজ চলাকালীন বহিরাগতদের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করায় শিক্ষার্থীরা এখন সম্পূর্ণ নিরাপদ ও নির্বিঘ্নে চলাচল করছে।
অধ্যক্ষ আরও জানান, শুধু পড়াশোনাতেই নয়, সহ-শিক্ষা কার্যক্রমেও শিক্ষার্থীরা দারুণ করছে। চলমান ‘নজরুল বর্ষ’ উপলক্ষে আয়োজিত কবিতা, গান, নৃত্য ও রচনা প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে শ্রীপুর সরকারি ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থীরা উপজেলা পর্যায়ে তিনটি ইভেন্টে প্রথম স্থান অধিকার করে জেলা পর্যায়ে যাওয়ার গৌরব অর্জন করেছে।
এসব কর্মযজ্ঞে এলাকার সুধীজন, সুশীল সমাজ এবং স্থানীয় প্রশাসন নিরন্তর সহযোগিতা করায় সর্বস্তরের মানুষের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে কলেজ কর্তৃপক্ষ। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় শ্রীপুর সরকারি ডিগ্রি কলেজ তার গৌরবময় অতীতকে সঙ্গী করে এক আদর্শ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে এগিয়ে চলবে এই প্রত্যাশা।